দেশীয় ও আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা যায়, মাদক ব্যবহারকারীদের দুই-তৃতীয়াংশই বয়সে তরুণ বা টিনএইজ। পশ্চিমা দেশগুলোতে প্রতি পাঁচজনের মধ্যে একজন তরুণ মাদকাসক্ত। আমাদের দেশে জাতীয় পরিসংখ্যান না থাকলেও এটুকু বলা যায় এ হার কোনো অংশে কম নয়।
জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এ সময়টি বিভিন্ন কারণে ঘটনাবহুল, চ্যালেঞ্জিং ও সমস্যাসংকুল। শিক্ষা, চাকরি, ব্যক্তিগত সম্পর্ক, আত্মোন্নয়ন এবং আধুনিক নগর জীবনের চাহিদার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে অনেকে এ বয়সে হতাশ, বিপথগামী এবং লক্ষ্যচ্যুত হয়ে পড়ে। অনেকে এ সময়ে আত্মপরিচয় সংকটে ভুগে থাকে। এতে তাদের ভেতর মানসিক চাপ বৃদ্ধি, উদ্বেগ, বিষণ্ণতা এবং আচরণগত সমস্যাসহ বিভিন্ন মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা বৃদ্ধি পায় যা মাদকাসক্তির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
সামাজিক ভীতি ও লজ্জার কারণে বেশিরভাগে ক্ষেত্রে তারা বিষয়টি কারো সঙ্গে ভাগাভিগি করতে চায় না। ফলে তারা নিজেদের গুটিয়ে নেয় ও সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
মাদকের সহজলভ্যতা, মাদক চোরাচালান, কৌতুহল, বন্ধুদের চাপ, আর্থ সমাজিক অবস্থাসহ বিভিন্ন ধরনের মনোসামাজিক কারণে তরুণদের মধ্যে মাদকাসক্তি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। মাদকাসক্তি থেকে পরবর্তীতে চুরি, ছিনতাই, অপহরণসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে তারা। মাদকের সহজলভ্যতা মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ হলেও একমাত্র কারণ নয়।
মাদকাসক্তির কারণ সম্পর্কে একটি প্রচলিত ভ্রান্ত ধারণা হচ্ছে ব্যক্তিগত হতাশা, ব্যর্থতা এবং অপ্রাপ্তি। বিষয়টি এরকম হলে প্রায় সবাই মাদকাসক্ত হওয়ার কথা। বাস্তবে ব্যাপারটি অন্যরকম। তরুণদের ব্যক্তিত্বের বিশেষ বৈশিষ্ট্য যেমন শৈশবে অপরাধ প্রবণতা ও আইন অমান্য করা, স্কুল পালানো ও ডানপিঠে স্বভাব ও অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ ও বেপরোয়া আচরণ মাদক গ্রহণের প্রবণতা বাড়িয়ে দেয়। অতি কৌতুহলী কিশোর ও তরুণ অনেকসময় মাদকাসক্ত বন্ধুর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারে না। টিনএইজে মাদকাসক্তির জন্য আরেকটি ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ হচ্ছে ধূমপান। গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের প্রায় সবাই (শতকরা ৭০-৮০ ভাগ) ধূমপায়ী। এ জন্য ধূমপানকে মাদকগ্রহণের সিড়ি হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ধূমপানবিরোধী ব্যাপক প্রচারণা সত্ত্বেও তরুণ সমাজে এর আকর্ষণ কতটুকু কমেছে তা বলা মুশকিল। তরুণদের মাদকাসক্তির আরো অনেক কারণ রয়েছে; যেমন: অপরাধপ্রবণ ও মৌলিক সুবিধাবঞ্চিত সামাজিক পরিবেশ, খেলাধুলা ও সুস্থ বিনোদনের অভাব, সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয় ইত্যাদি। অভিভাবক ও পারিবারের যেকোনো সদস্যের মাদকাসক্তির সমস্যা থাকলে অন্যদের ঝুঁকি বেড়ে যায় বহুগুণ। বাবা ও ছেলের একই সময়ে মাদকাসক্তি চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা হরহামেশাই দেখা যায়। শহুরে সংস্কৃতি তরুণদের মাদকাসক্তির জন্য ঝুঁকির বিষয়টি গবেষণায় উঠে এসেছে।
আমাদের দেশে তরুণদের মধ্যে গাঁজা, ফেনসিডিল, হেরোইন, ইয়াবা, মদ, ঘুমের ও ব্যথানাশক ওষুধ (পেথেডিন ও মরফিন), বিভিন্ন রাসায়নিক দ্রব্য (কাঠের আঠার গন্ধ শোকা বা গ্লু স্নিফিং) এখন বহুল ব্যবহৃত মাদকদ্রব্য যা সহজলভ্য। ইদানিং ইয়াবা ট্যাবলেট মাদক হিসেবে তরুণদের বিশেষভাবে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে খুবই জনপ্রিয়। মাদকদ্রব্য হিসেবে ব্যবহৃত এসব বস্তুর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো মস্তিষ্কের বিশেষ বিশেষ স্থানকে উদ্দীপ্ত করে যার ফলে সাময়িকভাবে তীব্র ভালোলাগার আনুভুতি হয়। কিছুদিন ব্যবহারের পর সহনীয়তা তৈরি হয়। ফলে একই মাত্রায় আর আগের মতো ভালোলাগা বোধ থাকে না। এজন্য মাদক ব্যবহারের পরিমাণ ধীরে ধীরে বৃদ্ধি পেতে থাকে যার ফল হয় দীর্ঘমেয়াদী আসক্তি।
মাদকাসক্ত একজন তরুণ-তরুণীর দিনের প্রায় বেশিরভাগ সময় ব্যয় হয় মাদক সংগ্রহ ও মাদকের কারণে সৃষ্ট শারীরিক ও মানসিক সমস্যা ও কষ্ট দূর করতে। ফলে তার দৈনন্দিন স্বাভাবিক কাজকর্ম, পড়াশুনা, ব্যক্তিগত এবং সামাজিক জীবন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মাদকের ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে অনেকে চুরি, ছিনতাই এমনকি মাদক ব্যবসায়ের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। মাদকাসক্ত একজন তরুণকে কখনো অপরাধী হিসেবে গণ্য করা যাবে না যতক্ষণ সে মাদক বিক্রি ও অন্যান্য অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে।
মাদকাসক্তি একটি মানোসামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সমস্যা। এজন্য মাদকাসক্ত তরুণকে বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার আওতায় আনা জরুরি। আসক্ত হওয়ার পর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে মাদক ব্যবহার না করলে প্রত্যাহার জনিত বিভিন্ন অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক সমস্যা হয়। এ কারণে মাদকাসক্ত ব্যক্তি একটি দুষ্টচক্রের মধ্যে পড়ে যায় এবং চাইলেও সে সহজে এর থেকে বেড়িয়ে আসতে পারে না।
আমাদের দেশে মাদকাসক্ত তরুণ-তরুণীর প্রকৃত সংখ্যা বলা কঠিন কারণ এ বিষয়ে কোনো জাতীয় পরিসংখ্যান নেই। তবে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের জরিপে দেখা যায়, শিশু-কিশোরদের ০.৮ ভাগ মাদকাক্তির সমস্যায় ভুগছে। এটুকু বলা যায়, এ হার বাস্তব অবস্থার খণ্ডচিত্র মাত্র। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী যেকানো বয়সী মাদকাসক্তের এ সংখ্যা প্রায় অর্ধকোটি যাদের শতকারা ৮০ ভাগের বয়স ১৮ থেকে ৩০ বছরেরে মধ্যে। বিপুল এ জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা সেবার জন্য সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় কেন্দ্র রয়েছে শুধুমাত্র ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, রাজশাহী, যশোর এবং কুমিল্লায় যা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সামান্য। অথচ প্রত্যেকটি জেলায় এ ধরনের সরকারি নিরাময় কেন্দ্র থাকা জরুরি।
মাদকাসক্তির চিকিৎসা একটি জটিল ও দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়া। কিন্তু চিকিৎসার সফলতা নির্ভর করে অনেকগুলি বিষয় ও শর্তের ওপর। চিকিৎসার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হচ্ছে রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আসক্ত তরুণ মাদকাসক্তির বিষয়টি গোপন করে সহায়তা নেওয়া থেকে বিরত থাকে। মাদকাসক্তির চিকিৎসার শুরুতে রোগীর বিস্তারিত ইতিহাস গ্রহণ, শারীরিক ও মানসিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ ও অন্যান্য মনোসামাজিক (অর্থনৈতিক অবস্থা, বাসস্থান, পড়াশুনা, চাকরি) এবং পারিবারিক অবস্থা নির্ণয় করা জরুরি। পারিবারিক সমর্থন ছাড়া এর চিকিৎসা প্রায় অসম্ভব।
চিকিৎসার প্রথম ধাপ হচ্ছে মাদকাসক্তির কারণে সৃষ্ট বিষক্রিয়া মুক্তকরণ বা ডিটকিক্সফিকেশন। আসক্তির তীব্রতা, মাদকের ধরন এবং মাদক ব্যবহারের ওপর এর পরিকল্পনা নির্ভর করে। তীব্র শারীরিক আসক্তি যেমন হেরোইন, ফেনসিডিলসহ সব ধরনের অপিয়েটস, বেনজোডায়াজেপিনস (ঘুমের ওষুধ), অ্যালকোহল ইত্যাদি ক্ষেত্রে ডিটকিক্সফিকেশনের জন্য হাসপাতালে ভর্তি আবশ্যক। মাদকাসক্ত ব্যক্তিকে তার নিজের বা অভিভাবকের সম্মতিতে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে বিশেষায়িত হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ভর্তির ক্ষেত্রে রোগীর অনিহা থাকলে চিকিৎসায় আশানুরূপ ফল পাওয়া যায় না। এসব ক্ষেত্রে মোটিভেশনাল কাউন্সেলিং বেশ কার্যকর পদ্ধতি। প্রায় সব মাদকাসক্ত তরুণের বিভিন্ন ধরনের শারীরিক ও মানসিক সমস্যা থাকে।
মাদকাসক্তির কারণে সৃষ্ট মানসিক রোগসমূহ: বিষণ্ণতা ও আত্মহত্যার প্রবণতা, ম্যানিয়া, উদ্বেগজনিত সমস্যা, ঘুমের সমস্যা, সাইকোটিক ডিসঅর্ডার (অহেতুক সন্দেহ, অস্বাভাবিক চিস্তা, অসংলগ্ন কথাবার্তা ও আচরণ, ভাঙচুর এবং সহিংস আচরণ, হ্যালুসিনেশন ইত্যাদি), যৌন সমস্যা ইত্যাদি।
মাদকাসক্তির কারণে সৃষ্ট শারীরিক সমস্যার চিকিৎসা: শারীরিক সমস্যার মধ্যে খাবারে অরুচি, পুষ্টিহীনতা, শরীরের বিভিন্ন স্থানে সংক্রমণ (ইনজেকশন ব্যবহারকারীদেব ভেতর বেশি), বিভিন্ন অঙ্গের রোগ যেমন, যকৃত, অন্ত্র, কিডনিসহ বিভিন্ন রকমের ক্ষতিকর রোগ ও ইনজুরি ও এক্সিডেন্ট রেকলেস ড্রাইভিং এবং হেপাটাইটিস ও এইডস এর প্রভাবে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে। অনেক সময় একইসঙ্গে অতিরিক্তি মাত্রায় মাদক গ্রহণে এর বিষক্রিয়ায় অজ্ঞান হয়ে যাওয়া, শ্বাস-প্রশ্বাসে অসুবিধা ও খিচুনিসহ বিভিন্ন ধরনের শারীরিক সমস্যা দেখা যায় যা জীবনহানির কারণ হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে।