যদি পারিবারিকভাবে বিয়ে হয়, তবে বিয়ের আগে আলাপচারিতার সুযোগ কম মেলে। যারা দীর্ঘদিন প্রেমের সম্পর্কে থাকার পর বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নেন, তাদেরও মাথায় রাখা প্রয়োজন যে, বিয়ের আগে ও পরের সম্পর্কের ব্যাকরণে অনেকটা ফারাক থাকে। জেনে নিন, বিয়ের আগে কোন কথোপকথন আবশ্যিক।
১) বিয়ের আগে সঙ্গীর অর্থনৈতিক অবস্থা নিয়ে আলোচনা করুন। দাম্পত্য জীবনে পরস্পরের অর্থনৈতিক অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকা অত্যন্ত প্রয়োজন। আর্থিক অবস্থা ভাল হোক বা মন্দ, দু’জনে কীভাবে এগোতে চান, তা বিয়ের আগেই আলোচনা করে নেওয়া ভালো। বিয়ের পর স্ত্রী উপার্জন করতে চান কি না, তা নিয়ে কথা বলুন। আপনার বাড়িতে কোনো সমস্যা থাকলে তা নিয়ে হবু স্ত্রীর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন।
২) বিয়ের মানেই সন্তান! সমাজ এগোলেও অনেকেই এই পুরনো ধারণাতেই বিশ্বাসী। কাজেই সন্তানধারণ নিয়ে ভাবি জীবনসঙ্গীর কী মতামত, তা আগে থেতেই জেনে নিন। অসম্মতি থাকলে আলোচনা করুন। অনেক ক্ষেত্রে চাইলেও সন্তানধারণে সক্ষম হন না অনেক দম্পতি, সে ক্ষেত্রে কী করণীয় হতে পারে, আলোচনা করুন তা নিয়েও। বিয়ের আগে কিছু রক্তপরীক্ষা করানো জরুরি। বিভিন্ন বেসরকারি ক্লিনিকে এই পরীক্ষাগুলো করানোর প্যাকেজ থাকে। এই পরীক্ষা দু’জনের স্বাস্থ্য ও আপনাদের জীবনে খুদে সদস্য এলে ওর স্বাস্থ্যের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ, তাই এই পরীক্ষাগুলোও বিয়ের আগে করিয়ে নেওয়া জরুরি।
৩) বিয়ে যৌনতায় সম্মতির চিহ্ন নয়। কাজেই যৌনজীবন নিয়ে আলোচনা করা অবশ্যই উচিত। যদি বিয়ের আগে যৌনতার অভিজ্ঞতা না থাকে, তা হলে তো এই আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজন। বিয়ের আগে অনেকেই যৌনজীবন নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা করতে লজ্জাবোধ করেন। তবে যৌনতা নিয়ে খোলাখুলি আলোচনা কিন্তু বিয়ের আগেও জরুরি। সুস্থ যৌনজীবন সুস্থ দাম্পত্যের চাবিকাঠি। কাজেই সংকোচের বিহ্বলতা ঝেড়ে ফেলে স্পষ্টভাবে কথা বলুন।
৪) বিয়েতে অনেক ক্ষেত্রেই দু’জন মানুষ ছাড়াও জড়িয়ে থাকে দু’টি পরিবার। দু’জনের পরিবারের সঙ্গে দু’জনের কেমন রসায়ন, তা-ও আগে থেকে জেনে নেওয়া ভাল। সঙ্গীর পরিবার নিয়ে মনে কোনোরকম সমস্যা হলে সে বিষয় আগেই কথা সেরে নিন। না হলে এই ছোট সমস্যাও বিচ্ছেদের কারণ হতে পারে।
৫) বিয়ের আগে অবশ্যই কথা বলুন পরস্পরের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে। এখনকার দিনে অনেকেই হীনম্মন্যতা বা মানসিক অবসাদ ভোগেন। অনেককে এই কারণের জন্য মনোবিদেরও সাহায্য নিতে হয়। আপনার এমন কোনও সমস্যা থাকলে সঙ্গীকে আগে থেকেই খুলে বলুন। আর সঙ্গীও এই প্রকার কোনও সমস্যায় ভুগছেন কিনা, তা জেনে নিন। সঙ্গীর নিরাপত্তাহীনতা বা মানসিক অবসাদে নিজের ভূমিকা কী হবে, তা নিয়ে সম্যক ধারণা থাকলে কমে দাম্পত্য কলহের আশঙ্কা।
বিবাহ কঠিন নয়, সহজ করতে হবে—এটা ইসলাম চায়। বিবাহ সহজ করার কথাই বলে ইসলাম। বিবাহ যদি কঠিন করা হয়, তাহলে সমাজে ব্যভিচার আর অন্যায় বাড়বে। কিন্তু বিবাহ যদি সহজ করা হয় তাহলে সমাজে ব্যভিচার কমবে শান্তি বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে আমরা নানাভাবে, নানা কায়দায় বিবাহ জিনিসটাকে কঠিন করে তুলেছি। বিবাহের কথা বিশাল আকারের কোনো পাহাড় মাথায় জেঁকে বসে। যার কারণে একজন পুরুষকে বিবাহের কথা ভাবতে হলে তাকে অনেক কিছুর কথা চিন্তা করতে হয়। নিচে আমরা বিবাহকে কিভাবে সহজ করতে হয় তা নিয়ে আলোচনা করব।
বিবাহ আল্লাহর নিদর্শন
বিবাহের আগে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের মধ্যে কোনো সম্বন্ধ থাকে না। কিন্তু বিবাহের পর তাদের মধ্যে এমন অদৃশ্য গভীর বন্ধন ও ভালোবাসা গড়ে ওঠে; তারা অতীত জীবনকে ভুলে গিয়ে সম্পূর্ণরূপে একে অন্যের হয়ে যায়। এখন আর একজন অন্যজন ছাড়া এক মুহূর্ত থাকতে পারে না। যৌবনকালে না হয় এ ভালোবাসার পেছনে জৈব তাগিদের কোনো ভূমিকাকে দাঁড় করানো যাবে; কিন্তু বৃদ্ধকালে কোন সে তাড়না এ ভালোবাসাকে স্থিত রাখে? তখন তো দেখা যায়, একের প্রতি অন্যের টান ও মমতা আরো বৃদ্ধি পায়।
এটাই কুদরতের সেই নিদর্শন, যার প্রতি আল্লাহ তাআলা দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘তাঁর এক নিদর্শন এই যে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদেরই মধ্য থেকে স্ত্রী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে গিয়ে শান্তি লাভ করো এবং তিনি তোমাদের পরস্পরের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয়ই এর ভেতর নিদর্শন আছে সেই সব লোকের জন্য, যারা চিন্তা-ভাবনা করে।’ (সুরা : আয়াত : ২১)
বড় আয়োজন বর্জন করতে হবে
আমাদের তরুণসমাজ অনেকেরই ধারণা বিবাহ করতে গেলে বিশাল বড় আয়োজন করতে হবে। যদি বড় আয়োজন না করে তাহলে মানুষ কী বলবে, লোকেরা কী ধারণা করবে! চক্ষুলজ্জায় হলেও আমাদের সাধ্যের বাইরে গিয়ে আয়োজন করতে হবে।
এমন মনমানসিকতা কমবেশি সবাই লালন করে। হাদিসে অলিমার কথা এসেছে। অলিমার ব্যবস্থা সাধ্য অনুযায়ী মানুষ আয়োজন করবে। লোক দেখানোর জন্য অলিমা করবে না। ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, বিয়ের প্রথম দিনের ভোজের ব্যবস্থা করা আবশ্যকীয়, দ্বিতীয় দিনের ভোজের ব্যবস্থা করা সুন্নত এবং তৃতীয় দিনের ভোজ হলো নাম-ডাক ছড়ানোর উদ্দেশ্যে। যে ব্যক্তি নাম-ডাক ছড়াতে চায়, (কিয়ামতের দিন) আল্লাহ তাআলা তাকে তদ্রুপ (অহংকারী ও মিথ্যুক হিসেবে) প্রকাশ করবেন। (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৯৭)
বিপুল অর্থের মোহর নির্ধারণ না করা
বিবাহ কঠিন হওয়ার আরেকটি বড় অন্যতম কারণ হচ্ছে চড়া মূল্যের মোহর নির্ধারণ করা। অথচ শরিয়ত নিজের সাধ্যের বাইরে গিয়ে, চড়া মূল্যে মোহর নির্ধারণ করাকে কোনোক্রমেই পছন্দ করে না। আবুল আজফা আস-সুলামি (রহ.) বলেন, একবার ওমর (রা.) আমাদের উদ্দেশ্যে ভাষণে বলেন, সাবধান! তোমরা নারীদের মোহর নির্ধারণে সীমা লঙ্ঘন করো না। কারণ যদি তা দুনিয়ার মর্যাদার বস্তু হতো এবং আল্লাহর কাছে পরহেজগারির বস্তু হতো, তাহলে তোমাদের চেয়ে নবী (সা.) হতেন এর যোগ্যতম ব্যক্তি। অথচ তিনি তাঁর স্ত্রীদের কারো মোহর এবং তাঁর কন্যাদের কারো মোহর ১২ উকিয়ার বেশি ধার্য করেননি। (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস : ২১০৬)
উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পেয়েও বিবাহ না দেওয়ার অনুচিত
অনেকেই আছেন নিজের ক্যারিয়ারকে অনেক উঁচুতে নিয়ে যাওয়ার জন্য বিবাহতে যথেষ্ট বিলম্ব করে থাকেন। উপযুক্ত পাত্র-পাত্রী পাওয়ার পরও বিবাহ দিতে চান না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বিনদারি ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছ তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তবে তার সঙ্গে বিয়ে দাও। তা যদি না করো তাহলে পৃথিবীতে ফিতনা-ফ্যাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস : ১০৮৪)
আমাদের প্যাকেজ এর লিংক: moonmarriagemedia.com/packages
ভিজিট করুন আমাদের ওয়েবসাইট: www. moonmarriagemedia.com